বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চার দিনের ভারত সফরে এসেছেন। শনিবার নতুন দিল্লিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও শেখ হাসিনা এক বৈঠকে মিলিত হন। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ইন্ডিয়ার নেতৃবৃন্দের বক্তব্য, মানবাধিকার সুরক্ষা যেভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে পড়ছে সে বিষয় সতর্ক দৃষ্টি দেওয়া দরকার।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ডিরেক্টর আকর প্যাটেল বলেন, মজবুত গণতন্ত্র নিয়ে যখন দু দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদ্বয় গর্ব অনুভব করেন তখন মানবাধিকার সুরক্ষার প্রতি তাদের প্রভূত নজর দেওয়া প্রয়োজন।

প্রথমত, সাংবাদিকরা যাতে স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করতে পারে ভারত ও বাংলাদেশ সরকারের উচিৎ তা দেখা। এসব ক্ষেত্রে ঔপনিবেশিক আমলের অপব্যবহারমূলক আইন প্রয়োগ করে এ বিষয় বাধা সৃষ্টি না করাই উচিৎ। এই আইনগুলো তৈরি হয়েছিল মূলত এই উপমহাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের কাজকে ব্যহত করতে। কিন্তু লজ্জাজনকভাবে আজও ভারত/ বাংলাদেশের সংবিধানের ফাঁকে এই আইনগুলো থেকে গেছে।

২০১৪ সাল থেকে বাংলাদেশে সরকারের সমালোচনামূলক সংবাদকে চেপে দেওয়ার উল্লেখজনক বৃদ্ধি পরিলক্ষিত হচ্ছে। যে সমস্ত সাংবাদিক সমালোচনামূলক সংবাদ পরিবেশন করছেন তাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদোহীতার বা মানহানির ফৌজদারী মামলা দায়ের করা হচ্ছে, নিয়মিতই। তথ্য-সম্প্রচার আইনের অস্বপষ্টতাকে হাতিয়ার করে নিশানা করা হচ্ছে সাংবাদিক, মানবাধিকার সুরক্ষা কর্মী, পরিবেশরক্ষা কর্মীদের এবং এমন অনেক মানুষকেও যারা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সমালোচনা করছেন। সশস্ত্র হানাদারবাহিনীর নিশানা যে সকল ধর্মীয় মৌলবাদের বিরোধী মানুষ ও ব্লগাররা, বাংলাদেশ সরকার তাদের সুরক্ষার বন্দোবস্ত করতেও প্রায়েই ব্যর্থ হয়েছে। ২০১৩ সাল থেকে এখন অবধি এই রকম নৃসংশ হত্যাকাণ্ডে সাত জন প্রাণ হারিয়েছেন।

ভারতবর্ষেও এধরণের ভিন্নমত পোষণকারী বা তার্কিকদের বক্তব্য কে চাপা দেওয়ার জন্যে এই আইনগুলো প্রয়োগ করা হয়ে থাকে। ফেসবুকে কোন সমালোচনামূলক বিবৃতি দেওয়ার জন্য বা মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে এমন কোন বিষয় নিয়ে সভা-সমতি হলে সেখানেও রাষ্ট্রদোহীতার আইনের অপব্যবহার হচ্ছে। কলেজ- বিশ্ববিদ্যালগুলিতেও বাক্‌-স্বাধীনতার অধিকার খর্ব করছে কিছু স্বঘোষিত “জাতীয়তাবাদ বিরোধী” প্রতিরোধ গোষ্ঠী। ভারতবর্ষের গ্রামঞ্চলে ছোট ছোট সংবাদ সংস্থার কর্মীরা চরম হেনস্থার শিকার হচ্ছেন। ছত্তিসগড়ের বস্তার অঞ্চলে কিছু স্বঘোষিত নজরদারী-গোষ্ঠী তৈরী করেছে হিংসা ও ভয়ের পরিবেশ, সরকারের নীরব প্রশ্রয়ের জোরেই। কোনো নির্দিষ্ট কারণ না দর্শিয়েই জম্মু-কাশ্মীরে বিভিন্ন সংবাদ সংস্থাকে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

দুঃখজনকভাবে ভারত/ বাংলাদেশের সিভিল সোসাইটি অর্গানাইজেশনগুলোকেও এধরণের ভীতি প্রদর্শন করা হচ্ছে।

২০১৬ তে বাংলাদেশ সরকার বিদেশী অনুদান বিষয়ক (ঐচ্ছিক) আইন (FDRA) প্রনয়ণ করে, যাতে বলা আছে সমস্ত বিদেশী অনুদানপ্রাপ্ত অসরকারী সংস্থাগুলিকে (NGO) তাদের কর্ম পরিকল্পনা অনুমোদনের জন্যে জমা দিতে হবে প্রধানমন্ত্রীর কার্য্যালয়ের অধীন এনজিও অ্যাফেয়ার ব্যুরো-তে। এই বিলে বলা আছে পরিকল্পনাগুলোতে যদি সরকার বিরোধী বা মানহানিকারক কোন শব্দ থাকে তাহলে সেই পরিকল্পনা বাতিল বলে গণ্য হবে যদিও এই আইনে বিরোধিতার বা সন্মানহানীর কোনো পরিভাষা নির্দিষ্ট করা হয়নি।

ভারতেও অসরকারী সংস্থাগুলোর বিদেশী অনুদান পাবার ক্ষেত্রে সরকারের বিদেশী অনুদান বিষয়ক আইন (FCRA) প্রয়োগ বাধার সৃষ্টি করে চলেছে। বিশেষত যে সমস্ত সংস্থা সরকারের সমালোচনা করছে। ২০১৬ তে বহু এমন সংস্থার লাইসেন্স পুনর্নবীকরণ হয়নি কোন নির্দিষ্ট কারণ ছাড়াই।

নিপীড়ণ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের থেকে বাঁচতে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর অজস্র মানুষ মায়ানমার থেকে পালিয়ে ভারত ও বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নিয়েছে।

মায়ানমারে মানবাধিকারের সঙ্কটজনক পরিস্থিতির মোকাবিলায় ভারত ও বাংলাদেশ কে যৌথ নিতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন আকর প্যাটেল। তিনি আরও বলেছেন, রাখিন (Rakhine) রাজ্যে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুধে ইউনাইটেড নেশন হিউম্যান রাইট কাউন্সিল যে আন্তর্জাতিক স্তরের অনুসন্ধান শুরু করেছে তা যাতে সুষ্ঠুভাবে চালিত হয় তা এই দুই দেশকে নিশ্চিত করতে হবে।

The English version of this press release can be found here https://www.amnesty.org.in/show/news/bangladesh-and-india-must-improve-human-rights-situation-alongside-bilatera/